১৩ অগাস্ট ২০২০, ০৩:৩৭ পূর্বাহ্ন

স্পেসাল
দাজ্জালের আগমন কি সন্নিকটে ?
tea

ইমরানুল হক, সুইডেন: ২০১৫ সালে ইসরায়েলের টেম্পল ইনস্টিটিউট একদল ইহুদী ধর্মগুরুদের একটি কমিটি গঠন করে লাল বাছুর খোঁজার কার্যক্রম শুরু করে। উদ্বোধনের তিন বছর পর ২০১৮ সালের ২৮ আগষ্ট প্রথম একটি সম্পূর্ণ লাল স্ত্রী-বাছুরের জন্ম হয়। তারপর, টেম্পল ইনস্টিটিউট লাল বাছুর জন্মের তাৎপর্য বর্ণনা করে তাদের ইউটিউব পেইজে একটি ভিডিও প্রকাশ করে।

এবছরের আগষ্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে টেম্পল ইন্সটিটিউট প্রস্তুতি হিসেবে লাল বাছুর উৎসর্গের রীতিনীতির চর্চা করে। ধারনা করা হচ্ছে যে কোন সময় লাল বাছুরটিকে উৎসর্গ করা হতে পারে। ইস্রায়েলে জীবিত গবাদিপশু আমদানি নিষিদ্ধ হওয়ার কারনে টেম্পল ইনস্টিটিউট রেড অ্যাংগাস প্রজাতির গরুর হিমায়িত ভ্রূণ আমদানি করে তা কৃত্রিমভাবে ইসরায়েলের গৃহপালিত গাভীর গর্ভাশয়ে প্রবেশ করে। ইতিপূর্বে, বেশ কয়েকটি বাছুরের জন্ম হলেও এটিই প্রথম সম্পূর্ণ লাল বাছুর যা হিব্রু বাইবেল বা তানাখের প্রয়োজনীয় সকল শর্ত পূরন করতে সক্ষম হয়। হিব্রু বাইবেলের ভবিষ্যৎ বাণী অনুযায়ী ৩য় মন্দির নির্মাণের পূর্বশর্তগুলোর মধ্যে একটি লাল বাছুরের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। লাল বাছুরটি এমন হতে হবে যার কোন ত্রুটি নেই, এটি স্ত্রীলিঙ্গের হতে হবে, যাকে কখনো জোয়াল খাটানো হয় নি এবং যার শরিরে সর্বোচ্চ দুটি অ-লাল লোম রয়েছে ।

প্রথম ও দ্বিতীয় মন্দির নির্মাণের পূর্বেও লাল বাছুর উৎসর্গ করা হয়েছিলো। হিব্রু বাইবেলের মতে এযাবৎকালে পৃথীবিতে মোট ৯টি লাল বাছুরের জন্ম হয়েছে এবং সবকটিই মন্দিরে উৎসর্গ কর হয়েছে। কেবলমাত্র দশম ও শেষ লাল বাছুরটি জন্ম ও উৎসর্গের পরেই ৩য় মন্দির নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে। টেম্পল ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক রাব্বি চাইম রিচম্যান ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে এটি সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে ,বিগত ২,০০০ বছর ধরে যদি কোনও লাল গরু জন্ম না হয়ে থাকে তবে সম্ভবত সময়টি ঠিক ছিল না; ইসরায়েল প্রস্তুত ছিল না। তবে এখনি সঠিক সময়, আমাদের বেঁচে থাকা সময়ের জন্য এর থেকে সার্থকতা আর কী হতে পারে, শুদ্ধ হওয়ার উপায় কাছে এসেছে। কিছু কিছু ইহুদি নেতাদের মতে লাল বাছুরের জন্ম ৩য় মন্দির নির্মাণ ও মন্দিরের সেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার এবং চূড়ান্ত মুক্তির পথ তৈরি করার সুসংবাদ নিয়ে এসেছে। লাল বাছুর খোঁজার কার্যক্রমের সাথে জড়িত ইসরায়েলের বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর জোহার আমার এটিকে পবিত্রতা এবং মুক্তির পথে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে অভিহিত করেছেন। ইহুদীরা মনে করে প্রথম ও দ্বিতীয় মন্দিরে লাল বাছুরের শরিরের উপাদান ছিলো যে কারনে এটি পবিত্র ছিলো।

কিন্তু দ্বিতীয় মন্দিরটি ধ্বংস হওয়ার পর থেকেই এই উপাদানগুলো অভাবযুক্ত ছিল কারণ মৃত ব্যাক্তির সংস্পর্শে আাসার কারনে এই মন্দিরটি অপবিত্র হয়ে যায়। সাথে সাথে সকল ইহুদীও অপবিত্র হয়ে যায় এবং মন্দিরের সেবা করার যোগ্যতা হারায়। দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও বর্তমানে জেরুজালমে এর পশ্চিমের দেয়ালের কিছু অংশ অবশিষ্ট রয়েছে যা ইহুদীদের কাছে উয়েইলিং ওয়াল বা মাতমের দেয়াল নামে পরিচিত। আজ পর্যন্ত কোন অপবিত্র ব্যাক্তির মন্দিরের ভিতরের অংশে প্রবেশের অনুমতি নেই। ধ্বংসপ্রাপ্ত ২য় মন্দিরে যেতে হলে ইহুদিদের প্রথমে একটি রীতি স্নান করতে হয়। রীতি স্নান করার পরেও তারা মন্দিরের ভেতরে অংশে প্রেবেশ করতে পারে না শুধুমাত্র বাহ্যিক অংশের মাতমের দেয়াল পর্যন্ত প্রবেশের অনুমতি প্রাপ্ত হয়। মন্দিরের ভেতরের অংশে ঢুকতে ও তার সেবা করার জন্য বিশুদ্ধ হওয়া আবশ্যক। হিব্রু বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী শুধুমাত্র লাল বছুর পুড়িয়ে এর ছাই বসন্তের পানিতে মিশিয়ে কোন অপবিত্র ব্যাক্তি ও জায়গার উপর ছিটিয়ে দিলেই কেবল তারা বিশুদ্ধ হতে পারবে।

হিব্রু বাইবেলে বর্ণীত "তাহলে আমি তোমাদের উপর শুদ্ধ জল ছিটিয়ে দেব এবং তোমাদের সমস্ত অপবিত্রা ও ভন্ড রবের কালিমা পরিষ্কার করব। আমি তোমাদের একটি নতুন হৃদয় দেব এবং তার মধ্যে একটি নতুন আত্মা রাখব" ইজেকেইল ৩৬। লাল বাছুর উৎসর্গ করে বিশুদ্ধতা অর্জনের পরে ইহুদীরা যে শুধু মন্দিরে ভেতরে ঢুকতে ও এটির সেবা করতে পারবে পারবে তা না, তারা তৃতীয় মন্দির নির্মাণের কাজও শুরু করে দিতে পারবে। আর কেবলমাত্র তৃতীয় মন্দির নির্মাণের পরেই তাদের নবীর আগমন ঘটবে, যে তাদের হাতে সমগ্র পৃথিবীর রাজত্ব এনে দেবে। হিব্রু বাইবেলে বর্ণীত ,হে ইহুদিকন্যা, তুমি আনন্দের সাথে চিৎকার দাও, ওহে জেরুজালেমের কন্যা, তুমি খুশিতে বাগবাগ হয়ে যাও। ঐ দেখ তোমাদের রাজা আসছেন। তিনি ন্যায় পরায়ণ। তিনি গাধার পিঠে আরোহণ করে আসছেন। আমি ইউফ্রিম থেকে গাড়িকে আর জেরুজালেম থেকে ঘোড়াকে আলাদা করে ফেলব। যুদ্ধের পালক উপড়ে ফেলা হবে। তার শাসন সমুদ্র থেকে জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত হবে (জাকারিয়াঃ৯ঃ৯ঃ১০)। মুসলিম চিন্তাবিদরা মনে করেন তৃতীয় মন্দির নির্মাণের পরে যে ইহুদীরা নবী বলে যাকে চিহ্নিত করবে সেই হলো দাজ্জাল। খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী মতে, ১০ম লাল গরুটি "সময়ের সমাপ্তি" এর পূর্বে জন্ম গ্রহন করবে এবং এর কিছু সময় পরেই এন্টিক্রাইস্টের (Antichrist) আগমন ঘটবে। এন্টিক্রাইস্টকে মানব জাতির তিন ভাগের এক ভাগকে খুন করে ফেলবে। তারপর, খোদ যিশু খ্রিষ্ট বা ঈসা (আঃ) এন্টিক্রাইস্টকে ধ্বংস করার জন্য পৃথিবীতে আবার আসবেন এবং তাকে ধ্বংস করবেন। এর কিছু কাল পরেই ডে অফ জাজমেন্ট বা কিয়ামত চলে আসবে। আল কুদস বা জেরুজালেমে তৃতীয় মন্দির নির্মাণের কাজটি মোটেই সহজ হবে না, কারণ, এর জন্য টেম্পল মাউন্ট’ Temple Mount বা আরবী الحرم الشريف হারাম এ শরিফ চত্বরের কেন্দ্রস্থলে নির্মিত ডম অফ রক Dom of Rock - আরবি قبة الصخرة বা কুব্বাত আস-সাখরা স্থাপনাটি ভাঙতে হবে। কারণ, ইহুদী ধর্মগুরুদের মতে যে জায়গায় এটি দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সেখানেই প্রথম মন্দিরটির অবস্থান ছিলো এবং মুসা (আঃ) প্রথম লাল বাছুরটি এখানেই উৎসর্গ করেন ও বাকি ৮টি লাল বাছুরও একই জায়গায় উৎসর্গ করা হয়েছে। এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ যে এই স্থাপনাটি মূলত মসজিদ হিসেবে নির্মিত হয়নি এবং এর মূল অংশে কোন মিম্বর নেই। হাদিসে বর্ণিত যে পবিত্র পাথরের উপর থেকে রাসূল(সাঃ) মি’রাজে গমন করেছিলেন বলে ধারণা, বর্তমান কুব্বাত আস-সাখরা স্থাপনাটির গম্বুজের ঠিক নিচে অবস্থিত হারাম এ শরিফের কেন্দ্রস্থলের সেই পাথরকে ঘিরে একটি মাজার হিসেবে এটি নির্মিত হয়েছিলো। সপ্তম শতাব্দীতে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান ধর্মীয় বিভিন্ন গুরুত্বের কারনে আল কুদস শহরে পবিত্র এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেন। মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত অষ্টভুজাকৃতির এই মাজারটির নকশা ও অলংকরণে সমসাময়িক বাইজেন্টাইন স্থাপত্যশৈলী এবং স্বতন্ত্র ইসলামিক সাংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। অনেকে এটিকে আল আকসা মসজিদ নামে চিনেন, যা প্রকৃতপক্ষে আল আকসা মসজিদ না। হারাম এ শরিফ চত্বরে উপরোল্লিখিত কুব্বাত আস-সাখরা স্থাপনাটির ২০০ মিটার দক্ষিণে রয়েছে ধূসর সীসায় আচ্ছাদিত উঁচু গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ যেটি প্রকৃতপক্ষে ‘আল-আকসা মসজিদ’।

দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রাঃ) ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেম বিজয়ের পর পবিত্র পাথরের দক্ষিণে একটি ছোট মসজিদ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক এই মসজিদটির পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেন যার কাজ শেষ হয় ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ছেলে আল ওয়ালিদের শাসনামলে। কালের পরিক্রমায় বহুবার মসজিদটি সংস্কার ও পুনর্গঠন করা হয় এবং যোগ করা হয় গম্বুজ, মিম্বর ও মিনারত। ইহুদীদের কাছে যেটি আল কুদস শহরের যে দেয়াল মাতমের দেয়াল নামে পরিচিত মুসলিমদের কাছে সেটি আল বুরাক দেয়াল নামে সমাদৃত, যেখানে নবী (সঃ) বুরাক নামক প্রানীকে বেধে রেখেছিলেন। ৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা ২য় মন্দির ভেঙে ইহুদিদের আল কুদস থেকে বিতাড়িত করে। ১ম বিশ্বযুদ্ধের পরে উসমানীয় খেলাফতের পতনের ঘটলে প্রায় ১৯০০ বছর পর ইহুদীরা তাদের পূর্বপুরুষদের স্থানে ফিরে আসা শুরু করে। ১৯৪৮ সালে আরব ভুমিতে অবৈধভাবে ইসরায়েল রাস্ট্রের জন্মের পর থেকে ইহুদীরা আরব মুসলিমদের জায়গা দখল করা শুরু করে। ধিরে ধিরে তারা ফিলিস্তিনের প্রায় ৯০ ভাগ জাগয়া দখল করে নেয়। বর্তমানে আল আকসা মসজিদ, কুব্বাত আস-সাখরা, আল বুরাক দেয়াল সহ পবিত্র নগরী আল কুদস শহরের সিংহভাগ অংশ ইসরায়েলিরা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। অনেক ইসলামি চিন্তাবিদরা মনে করেন লাল গরুটিকে উৎসর্গ করার পরে, কৃত্রিমভাবে ভুমিকম্প সৃষ্টি করে অথবা অন্য কোন উপায়ে কুব্বাত আস-সাখরা ধ্বংস করে এর স্থলে তৃতীয় মন্দির নির্মাণ করা শুরু করবে। কারণ ইতিমধ্যে ইসরায়েল আল বুরাক দেয়ালের পাশ থেকে শুরু করে কুব্বাত আস-সাখরা মাজারের নিচে সুরঙ্গ খোঁড়ার কাজ শুরু করে দিয়েছে। ২০১৭ সালে মে মাসে আল বুরাক দেয়ালের নিচের কৃত্রিম গুহার মধ্যে ইসরায়েল মন্ত্রী পরিষদের একটি বৈঠকও আয়োজন করা হয়। ইসরায়েলের যদি কুব্বাত আস-সাখরা ভেঙে ৩য় মন্দির নির্মাণে সফল হয়ে যায় তবে দাজ্জাল আসতে খুব বেশি দেরি নেই! দাজ্জালের আগমণ হচ্ছে কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সবচেয়ে বড় আলামত। মানব জাতির জন্যে দাজ্জালের চেয়ে বড় বিপদ আর নেই। বিশেষ করে সে সময় যে সমস্ত মুমিন জীবিত থাকবে তাদের জন্য ঈমান নিয়ে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। সমস্ত নবীগন তাদের উম্মতকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করে গেছেন। নবী (সাঃ) দাজ্জালকে স্বপ্নে দেখে তার শারীরিক গঠনের বর্ণনাও প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, দাজ্জাল হবে বৃহদাকার একজন যুবক পুরুষ, শরীরের রং হবে লাল, বেঁটে, মাথার চুল হবে কোঁকড়া, কপাল হবে উঁচু, বক্ষ হবে প্রশস্ত, চক্ষু হবে টেরা এবং আঙ্গুর ফলের মত উঁচু। তাছাড়া দাজ্জালকে চেনার সবচেয়ে বড় আলামত হলো তার কপালে কাফের (كافر) লেখা থাকবে ,বুখারি, অধ্যায় কিতাবুল ফিতান।

সম্পর্কিত খবর

একটি মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত মন্তব্য

img
img
img