১১ অগাস্ট ২০২০, ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন

মুক্তমত
একজন সফল পিতা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান
tea

সাদেকুল আমিন, লন্ডনঃ আদিকাল থেকে, যুগে যুগে, মানুষ তার জীবিকার অন্বেষণে ও জীবনের মান উন্নয়নের জন্য দেশ থেকে দেশান্তরে পাড়ি দিচ্ছে।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে মধ্যভাগ পর্যন্ত কানাইঘাট এলাকার মানুষ দ্বীন, আমল আখলাকের সহায়ক সমাজ ব্যবস্থা ও পরিস্থিতি না থাকার কারনে বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোতে যেতে বেশ রিলাকটেন্ট ছিলেন। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে এর ব্যতিক্রম বেশ লক্ষণীয়।

ষাটের দশকে যুক্তরাজ্যে অত্যন্ত কম সংখ্যক কানাইঘাট এলাকার মানুষ ছিলেন। মুষ্টিমেয় যে ক`জন ছিলেন তাদের মধ্যে মরহুম আব্দুর রকিব সাহেব ছিলেন অন্যতম। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা। জড়িত ছিলেন লন্ডনের বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠনের সাথে। যে সমস্ত সংগঠনের তিনি নেতৃত্ব দেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ সেন্টার ও লন্ডন জামে মসজিদ (ব্রিকলেইন)। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় লন্ডনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সে সময়ে তিনি জাস্টিস আবু সাঈদ চৌধুরীর দূত হিসাবে দিল্লি সফর করেন। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৮৫ সালে তিনি কানাইঘাট উপজেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

উল্লেখ্য যে, ইস্ট লন্ডনের ১০৬ মাইলেন্ড রোডে অবস্থিত প্রখ্যাত ইন্ডিয়া গ্রীল রেস্টুরেন্ট জনাব আব্দুর রকিব সাহেবের মালিকানাধীন ছিল। এ রেস্টুরেন্টে ১৯৮৫ সালের ২২ই সেপ্টেম্বর কানাইঘাট এসোসিয়েশন ইউকে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ষাট দশকের প্রথম দিকে ইউকে সরকার ভাউচার ভিসা চালু করে। তখন তিনি তাঁর চাচতো ভাই মোহাম্মদ আব্দুর রহমান সহ এলাকার কয়েকজনকে ভিসার ব্যাবস্থা করে দেন। এ সুবাদে মোহাম্মদ আব্দুর রহমান, আব্দুল কাহির চৌধুরী ও মরম আলী সাহেবরা লন্ডনে আসেন।

সোমবার, ১৩ই জানুয়ারি ২০২০ সাল। ইংল্যান্ডে শীতের মৌসুম। বাহিরে বেশ ঠান্ডা ও প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের গন্তব্য ইস্ট লন্ডনের মাইলেন্ড এলাকার টার্নার রোড। কি আর করা, কথা মতো কানাইঘাট এসোসিয়েশন ইউকের সেক্রেটারি মোহাম্মদ মখলিছুর রহমান ও আমি রাত প্রায় সাড়ে ৮ টার সময় হাজির হলাম আমাদের গন্তব্যে।

আজ আমরা একান্ত আলাপ করবো কানাইঘাট এসোসিয়েশন ইউকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সম্মানিত প্রবীণ মুরুব্বি ও একজন সফল পিতা জনাব মোহাম্মদ আব্দুর রহমান সাহেবের সাথে।

মোহাম্মদ আব্দুর রহমান ১৯৪১ সালের ৩রা মার্চ সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার দক্ষিণ বানীগ্রাম ইউনিয়নের বড়দেশ উত্তর গ্রামের এক মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হাজী ওয়াজিদ আলী ও মাতা মোছাম্মাৎ খাদিজা বিবি। দাদা হাজী লাল মিয়া ও নানা আম্বর আলী। তাঁর ছয় ভাই ও তিন বোন। তিনি ভাই বোনদের মধ্যে সবার বড়।

ইংল্যান্ডে আসার পূর্বে তিনি কিছুদিন সর্দারিপাড়া প্রাইমারি স্কুলে পড়ালেখা করেন। তারপর ইংল্যান্ডে তিনি তাঁর কর্ম জীবনের কঠিন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন।

তিনি ১৯৬২ সালের মার্চ মাসে লন্ডনে আসেন। আসার পর তিনি নিউ রোডের রাজমহল রেস্টুরেন্টে কাজ করেন। পরে তিনি নিউক্যাসল শহরে চলে যান। সেখানে তিনি কিছুদিন কাজ করে চলে আসেন লন্ডনে এবং একটি কফি সপে কাজ করেন। তারপর তিনি দুই বছর লন্ডনের উডগ্রীন এলাকায় এক ব্রেড ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। পরে তিনি প্রায় তিন বছর ইস্ট লন্ডনের Gants Hill এলাকায় একটি রেস্টুরেন্টে সেফের কাজ করেন। ১৯৮২ সালে তিনি ইন্ডিয়া গ্রীল রেস্টুরেন্টের পার্টনার হন এবং সেখানে তিনি কানাইঘাটের সিরাজ উদ্দিন ও ইসরাক আলী সহ অন্যদের সাথে কাজ করেন। পরে তিনি বেশ কিছু়দিন Tower of London এর পাশে Celebrity Chef Cyrus Todiwala OBE এর মালিকানাধীন পুরস্কার প্রাপ্ত রেস্টুরেন্ট `Cafe Spice Namaste` তে কাজ করেন। তাঁর সাথে কানাইঘাটের বেশ কয়েকজন এ রেস্টুরেন্টে কাজ করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আব্দুর রহমান সাহেবর অবদান রয়েছে। তখন লন্ডনে প্রবাসীরা যে fund raise করে সেখানে তিনি তাঁর কষ্টার্জিত এক সপ্তাহের বেতন দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ১৯৭৩ সালে দেশে যান। এ সালের মার্চ মাসে তিনি দক্ষিণ বানীগ্রাম ইউনিয়নের বড়দেশ উত্তর গ্রামের মাওলানা আব্দুল ওহিদ ও মোসাম্মাৎ কামরুন নেসার মেয়ে মোসাম্মাৎ খয়রুন নেসাকে বিয়ে করেন। তখন তিনি বেশ কিছুদিন দেশে থাকেন এবং ১৯৭৬ সালে লন্ডনে ফিরে আসেন।

১৯৮২ সালের মে মাসে তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে লন্ডনে নিয়ে আসেন। তখন তিনি ইস্ট লন্ডনের টেন্ট ষ্ট্রীটের এক ফ্ল্যাটে থাকতেন। পরে ১৯৮৩ সালে তিনি স্টেপনি গ্রীন এলাকার কার ষ্ট্রীটের এক বড় ফ্ল্যাটে চলে যান। সেখানে বেশ কয়েক বছর থাকার পর তিনি ১৯৯৮ সালে টার্নার রোডে চলে আসেন। বর্তমানে তিনি তাঁর পরিবার পরিজনদেরকে নিয়ে এখানে প্রায় ২২ বছর থেকে বসবাস করছেন।

আজ আমরা আলাপ করি উনার Kitchen এর Dining টেবিলে বসে। তিনি নিজে আমাদের জন্য চা বানালেন এবং সাথে বিস্কুট দিলেন। তখন আমার মনে পড়ে গেল উনার বাসার বসার রোমে কানাইঘাট এসোসিয়েশন ইউকের কত বৈঠকের কথা। আর বিশেষ করে মনে পড়ল আপ্যায়নের কথা। যার মধ্যে থাকত সামোসা, গুড়ের পিঠা, চা, বিস্কুট, ফল এবং সাথে পান সুপারি।

মোহাম্মদ আব্দুর রহমান কানাইঘাট এসোসিয়েশন ইউকের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি দুই বার এ সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন। প্রথমে ১৯৯৯ থেকে ২০০২ এবং পরে ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত। বর্তমানে, তিনি এ সংগঠনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।

তিনি দীর্ঘ প্রায় ৫৮ বছর লন্ডনে আছেন। তাঁর বন্ধু ও সহকর্মীদের মধ্যে অনেকেই আজ আর নেই। তাঁদের মধ্যে কানাইঘাটের মরহুম মরম আলী, মরহুম মসরব আলী, মরহুম তৈয়্যব আলী, মরহুম আব্দুল জলিল ও মরহুম আব্দুল হক সাহেব।

তাঁর বন্ধুরা হলেন জনাব মোহাম্মদ মখলিসুর রহমান, হাজী হায়াত উল্লাহ্ ও জনাব আব্দুল কাহির চৌধুরী।

মোহাম্মদ আব্দুর রহমান একজন সফল পিতা। তাঁর তিন ছেলে - বড় ছেলে মোহাম্মদ মোস্তাক আহমদ (বেলাল) - একাউনটেন্ট, মেজো ছেলে ডাঃ মোহাম্মদ কবির আহমদ (দুলাল) - জি পি এবং ছোটো ছেলে মোহাম্মদ জাবের আহমদ (হেলাল) একজন একাউনটেন্ট। চার মেয়ে সাজেদা খাতুন, রুকেয়া খাতুন সহকারী শিক্ষক হিসাবে কাজ করেন, সাহানা খাতুন সমাজবিজ্ঞানে ডিগ্রী করেন ও সাজনা খাতুন একজন কোয়ালিফাইড শিক্ষক। ছেলে মেয়েদের সাফল্যের পেছনে কার বেশি অবদান জিজ্ঞাস করলে তিনি তাঁর স্ত্রীর কথা অবলীলায় স্বীকার করে বলেন এটা সব তাদের মায়ের অবদান।

আমরা দোয়া করি আল্লাহ যেন মোহাম্মদ আব্দুর রহমান সাহেবকে নেক হায়াত দেন। আমিন।

সম্পর্কিত খবর

একটি মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত মন্তব্য

img
img
img