২৭ নভেম্বর ২০২১, ১১:৫১ পূর্বাহ্ন

মুক্তমত
একজন দানবীর হাজী আব্দুস সাত্তার
tea

এমডি. জে রানা (নিউইয়র্ক থেকে ): যুগে যুগে পৃথিবীতে কিছু মানুষ এসেছেন প্রেরণার উৎস হয়ে। যারা স্ব-স্ব প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে এনেছেন আলোর সন্ধান, নিজেদের সৃষ্টি বা কর্ম দ্বারা গড়েছেন ইতিহাস। এদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুর আগে নিজের সম্পদ মানুষের সেবায় বিলিয়ে গেছেন। বিনিময়ে তিনি পেয়েছেন মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। এইসব দানবীর ব্যক্তিরা মরেও অমর হয়ে আছেন। হাজী আব্দুস সাত্তার ছিলেন এমনি এক ক্ষণজন্মা পরোপকারী ও দানশীল ব্যক্তিত্ব। 

হাজী আব্দুস সাত্তার সমাজের মহৎ ও ভাল কাজের জন্যে নিজের ধনসম্পদ অকাতরে বিলিয়ে গেছেন। শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারে ব্যয় করার জন্য এই অঞ্চলে দানবীর হিসাবে খ্যাতি পেয়েছেন তিনি। 

হাজী আব্দুস সাত্তার  বহুগুণে গুণান্নিত একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। তিনি ১৮৮৮ সালে সিলেট সদর উপজেলার ৬নং টুকের বাজার ইউনিয়নের হায়দর পুর গ্রামের এক সম্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম হাজী আহমদ উল্ল্যাহ। তাৎকালিন সময় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার তেমন সুযোগ না থাকায় তিনি বাংলা ও ইংরেজী শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। তবে রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের সন্তান হিসাবে বাল্যকালে তিনি ইসলামিক শিক্ষা অর্জন করেন। 

শিক্ষা বিস্তারে  বিশেষ করে ইসলাম শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অন্যতম ভুমিকা রয়েছে। তিনি বৃহত্তর টুকের বাজার টুকের বাজার এলাকার আরেক কৃতি সন্তান মরহুম সিরাজ উল্লাহ সাহেবের পরামর্শে ১৯৫১ সালে এলাকায় প্রথম দ্বীনি শিক্ষা প্রসারের জন্য "হাজী আহমদ উল্ল্যা নামের একটি মাদ্রাসা স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। তাঁর একক অর্থায়ানে মাদ্রাসার কাজ আরম্ভ হয়েছিল। পরবর্তীতে স্থানীয় মানুষের অনুরোধে বৃহত্তর এলাকায় কোন স্কুল না থাকায় মাদ্রাসার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তার স্থলে ১৯৬২ সালে হাজী আব্দুস সাত্তার স্কুলটি স্থাপন করা হয়। তাঁর ব্যক্তিগত অর্থায়নে প্রাথমিক ভাবে স্কুল ভমনটি নির্মাণ করা হয়। এছাড়া তিনি বৃহত্তর টুকের বাজারের অন্যতম দ্বীনি প্রতিষ্ঠান রশিদিয়া দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্টা ও রক্ষানাবেক্ষনে বিপুল অর্থ প্রদান করেন। 

তিনি শুধু দ্বীনি শিক্ষায় নয় আধুনিক শিক্ষায় যাতে মানুষ শিক্ষিত হতে পারে তার জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্টানে তাঁর সম্পদ  দুহাতে অকাতরে বিলিয়ে গেছেন। ১৯৬২ সালে নিজ জমির উপর হাজী আব্দুস সাত্তার হাই স্কুল নির্মাণ , ১৯৪০ নিজ গ্রামে মসজিদ স্থাপন, হায়দরপুর ও পীরপুর মসজিদের স্থায়ী আয়ের জন্য সাড়ে ২৬ বিঘা জমি দান, মদন মোহন কলেজ অর্থ সহায়তা, বন্দর বাজার মসজিদে বোর্ডিং নির্মাণ, নিজ জমির উপর বৃহত্তর টুকের বাজারে ঈদগাহ নির্মাণ , টুকের বাজার ইউনিয়ন অফিসের জন্য জমি দান। শুধু এ দেশে তাঁর দানের হস্ত সীমাবদ্ধ থাকেনি তিনি ভারত-পাকিস্তান সহ আরব দেশেও  দানের সাক্ষর রেখেছেন। তার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য মদীনা ইউনিভার্সিটিতে পাকিস্তান আমলের ত্রিরিশ হাজার টাকা দান এবং সৌদিআরবের সৌলত কিয়ায় একটি বোর্ডিং নির্মাণ করেন। সিলেট ছাড়াও কিশোরগঞ্জে একটি মাদ্রাসায় বিপুল অর্থ সহায়তা প্রদান করেছেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে নিজ সম্পত্তির  একাংশ ১৬২ টি মসজিদ ও ৩৭টি মাদ্রাসায় দান করেন। 

এতো সম্পদের মালিক হয়েও হাজী আব্দুস সাত্তার ছিলেন খুব ধার্মিক ও নিরহঙ্কারী। তিনি সর্বদা সহজ সরল জীবনযাপন করতেন। তিনি সব সময় জামায়েত সহিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। এমনকি শীতের সময় যখন হাওরে মৎস্য বিলে মাছ আহরন ব্যস্ত থাকতেন তখনও হাওরে জামায়াতে নামাজ পরতেন। নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়া ছিল তার স্থায়ী অভ্যাস। এলাকার দ্বীন-দুঃখী ও দুস্থদের সেবায় তিনি নিজের সব কিছু বিলিয়ে দিতেন। এই দয়ার সাগর ১৯৯২ সালে ১০ জানুয়ারি ১০৪ বছর বয়সে নিজ বাড়িতে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তিনি বহু আত্মী-স্বজন রেখে গেছেন।

দীর্ঘ এ জীবনে তিনি তিনবার বিবাহ বন্ধনে আবব্দ হন। তাঁর প্রথম দুই স্ত্রীর সাত ছেলে ও ছয় মেয়ে রয়েছে । প্রথম ও দ্বিতীয়  স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি তৃতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবব্দ হন। তৃতীয় স্ত্রী কোন সন্তানাধী নেই।তবে তৃতীয় স্ত্রী একশত বছরের উপরে বয়স হলেও হাজী আব্দুস সাত্তার শেষ সৃস্মি নিয়ে এখনও বেঁচে আছেন। তাঁহার পঞ্চম ছেলে হাজী আব্দুল মুছব্বির লালাই মিয়ার তত্ত্বাবধান তিনি রয়েছেন। 

বর্তমানে হাজী আব্দুস সাত্তারের চার ছেলে ও তিন মেয়ে মৃত্যুবরন করেছেন গেছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।  

মরহুম হাজী আব্দুস সাত্তারের দান ও সমাজ সেবার উল্ল্যেখ যোগ্য অংশে সংক্ষিপ্ত বিবরণ :

#১৯৬২ সালে হাজী আব্দুস সাত্তার উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্টা করেন। 

# ১৯৪০ সালে হায়দরপুর পুরাতন মসজিদ তিনি ও তার পরিবাারের সদস্যরা প্রতিষ্টা করেন। 

# হায়দরপুর ও পীরপুর গ্রামের স্থায়ী আয়ের জন্য সাড়ে ১২ কেদার ও ২৬ কেদার জমি দান করেন। 

# টুকের বাজার প্রায় সবগুলো মসজিদের প্রচুর আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। 

# বন্দর বাজার জামে মসজিদের বোডিং এর প্রতিষ্টাতা ও পরিচালনা কমিটির আজীবন সদস্য। 

# খোজার খলা মসজিদ ও হযরত শাহপরান (র:) দরগাহের সংস্কারে উল্ল্যাখযোগ্য আর্থিক সহায়তা প্রদান। 

# টুকের বাজার শাহী ঈদগাহের মূল জমিদাদা ও ইদগাহ প্রতিষ্টাতা। 

# ৬ নং টুকের বাজার ইউনিয়ন অফিসের জন্য জমি দান ও ইউনিয়ন অফিস প্রতিষ্ঠার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান। 

# বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত-পাকিস্তানের উল্লেখযোগ্য

কওমি মাদ্রাসায় আর্থিক সহায়তা প্রদান। 

# সৌদিআরবের সৌলতিয়া মাদ্রাসায় নিজের নামানুসারে একটি বোডিং প্রতিষ্ঠা করোন। 

# মদীনা ইউনিভার্সিটিতে আর্থিক সহায়তা প্রদান। ( পাকিস্তান আমলের ত্রিরিশ হাজার টাকা। )

# কিশোরগঞ্জ একটি মাদ্রাসায় বিপুল টাকা দান করেন। 

তিনি ব্যক্তি জীবনে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন।  ১৯৪৪ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত সিলেট জেলা মুসলিম লীগের কোষাধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেন। মুসলিম লীগের উন্নতি সাধনের জন্য অকাতরে আর্তিক সহায়তা প্রদান করে গেছেন। দ্বি-জাতি তত্ত্বে ভিত্তিতে দেশ ভাগের সময় সিলেট জেলা মুসলিম লীগের প্রতিষ্টাতা সভাপতি অত্র এলাকার আরেক কৃতি সন্তান মরহুম মওলানা আব্দুর রশিদের সহযোগিতায় সিলেট তৎকালিন পাকিস্তানের সাথে যোগ দেয়ার গনভোট নেতৃত্বদানকারী অনেকের মধ্যে হাজী আব্দুস সাত্তার ছিলেন অন্যতম। এছাড়া কর্মজীবনে তিনি একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্টিত করেন। যার ফলে দীর্ঘ প্রায় দেড়যুগ তিনি সিলেট জেলা মৎস্যজীবী  সমবায় সমিতির সভাপতি ছিলেন। 

মরহুম হাজী আব্দুস সাত্তারের সম্মাননার স্বার্থে ১৯৯৩ সালে তখনকার যুব সমাজের উদ্যোগে গুনিজন স্মৃতি সংসদ নামের নয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে সভাপতি ছিলেন এ.কে এম তারেক কালাম ও সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মুজিবুর রহমান। পরে দিলওয়ার হোসেন দিলুর (বর্তমানে ইতালি প্রবাসী ) উদ্যোগে ও তাঁর সম্পাদনায় "চীরঞ্জীব হাজী আব্দুস সাত্তার নামের একটি ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছিল। সেই ম্যাগাজিনের টুকের বাজার সহ  বৃহত্তর সিলেটের সব গুনিজনরা হাজী আব্দুস সাত্তারের পক্ষে বানী, কলাম লিখেছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম খন্দকার আব্দুল মালিক, সাবেক এম.পি আহমদ আশরাফ আলী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর সদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী, সিলেট সরকারী পাইলট স্কুলে শিক্ষক আব্দুর রহিম, অধ্যাপক গ.ক.ম আলমগীর, মদন মোহন কলেজের অধ্যাপক মো. আকরম আলী , অধ্যাপক শফিকুর রহমান , অধ্যাপক মো. সিরাজুল ইসলাম ,আলীয়া মাদ্রাসার শিক্ষক আব্দুল সাত্তাহ, অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম প্রমুখ। এছাড়া উক্ত ম্যাগাজিনে হাজী আব্দুস সাত্তারকে নিয়ে বেশ কিছু কবিতা ও ছড়া লেখা হয়েছে।

মরহুম হাজী আব্দুস সাত্তারের ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনীরা পৃথবীর বিভিন্ন দেশে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন। দেখা হল তাঁর নাতি ইব্রাহিম আলী সাথে। তিনি জানান,তার দাদার পরিচয়ে তিনি ও তার পরিবার অত্যান্ত গর্বিত।এ পরিচয় তাদেরকে  সব সময় সম্মানিত করেছে। তাঁর দাদা সারাজীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। আল্লাহ সন্তুষ্টি লাভের জন্য তিনি দেশে-বিদেশে বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর দেখানো পথ ধরেই তিনি হাটতে চান। তাই তিনি ও তাঁর ভাই-বোনরা মিলে নিজের পিতা-মাতার নামে আব্দুল মুছব্বির-কুলছুমা এডুকেশন এন্ড ওয়েলফেয়ার নামের একটি ট্রাস্ট গঠন করেছেন। তিনি নিজে এই ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও তাঁর আপন ছোট ভাই ভাইস চেয়ারম্যান মো. জাকারিয়া। মো. জাকারিয়া নিউইয়র্কের পাশবর্তী স্টেট মেরিল্যান্ড শহরে এবং তাঁর বোনরা নিউইয়র্ক সিটিতে বসবাস করেন। এ ট্রাস্টের মূল লক্ষ হচ্ছে অসহায়-দুঃস্থদের সাহায্য-সহযোগিতা করা, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন মূলক বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনা করা। এছাড়া তাঁর বাবা আব্দুল মুছব্বির লালাই মিয়াও বিভিন্ন সমাজিক মূলক কাজ করে থাকেন। বর্তমান হায়দরপুর শাহী জামে মসজিদে সাত ডেসিমেল জায়গা তিনি দান করেছেন। 

বি:দ্র: লেখাটির তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে চীরঞ্জীব হাজী আব্দুস সাত্তার নামের ম্যাগাজিন থেকে।

সম্পর্কিত খবর

একটি মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত মন্তব্য

img
img
img